আর্মড পুলিশে বদলে যাচ্ছে শাহজালাল বিমানবন্দর
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর একসময় দেশি-বিদেশি যাত্রীদের কাছে এক আতঙ্কের নাম ছিল। যাত্রী হয়রানি থেকে শুরু করে দালালদের দৌরাত্ম্য, লাগেজ চোর, টানা পার্টি এবং পরিবহন শ্রমিকদের দৌরাত্ম্যে অতিষ্ঠ থাকতেন দেশি-বিদেশি যাত্রীরা। নিরাপদ অবতরণ ও উড্ডয়ন ছিল হুমকির মুখে। পরিবহন শ্রমিকদের দৌরাত্ম্য ছিল চরমে। বিমানবন্দর ছিল যেন গাবতলী, সায়েদাবাদ ও সদরঘাটের মতো টার্মিনাল। সিভিল এভিয়েশনের কোনো রকম নিয়ন্ত্রণ ছিল না। বিমানবন্দরের একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তারা আঙুল ফুলে হয়েছেন কলাগাছ। সামগ্রিক অর্থেই বিমানবন্দরটি ছিল ঝুঁকিপূর্ণ। একসময়ের শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ছিল সারাবিশ্বের বিমানবন্দরগুলোর মধ্যে বিপজ্জনক। আইকাও (ইন্টারন্যাশনাল সিভিল এভিয়েশন অথরিটি) রেটিংও ছিল থার্ড ক্যাটাগরিতে। বর্তমানে সে অবস্থা থেকে উৎরেছে। এখন ক্যাটাগরির ২-এ অবস্থান করছে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। ২০১০ সালে এয়ারপোর্ট আর্মড পুলিশ প্রতিষ্ঠার পর থেকে পাল্টে যাচ্ছে সার্বিক চিত্র। গত চার বছরে প্রায় পাঁচ হাজার বিভিন্ন ধরনের অপরাধী গ্রেফতার হয়। আর পুলিশের ইউনিটটি গত তিনবার চোরাচালান পণ্য উদ্ধারে প্রথম স্থান অধিকার করে। সার্বক্ষণিক ৩৫০ জন পুলিশের নজরদারিতে থাকে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর।
বিমানবন্দর আর্মড পুলিশ প্রতিষ্ঠা যেভাবে : বিমানবন্দরের চরম নাজুক অবস্থাতে ২০১০ সালের ২৪ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে বসে দশম গোয়েন্দা সম্মেলন। ওই গোয়েন্দা সম্মেলনে দেশের বিমানবন্দরগুলোর নাজুক পরিস্থিতি উঠে আসে। তারই পরিপ্রেক্ষিতে বিমানবন্দরগুলোকে কি পয়েন্ট ইনস্টলেশন (কেপিআই) হিসেবে ধরে নিয়ে নিরাপত্তার জন্য বিশেষায়িত পুলিশের প্রয়োজনীয়তা অনুধাবিত হয়। তারই পরিপ্রেক্ষিতে সর্বসম্মত সিদ্ধান্তক্রমে এয়ারপোর্ট আর্মড পুলিশ গঠনের প্রস্তাব করা হয়। এরপর ওই বছরের ১ জুন বিমানবন্দরে কার্যক্রম শুরু করে আর্মড পুলিশ।
৪ বছরে গ্রেফতার ৫ হাজার অপরাধী : দীর্ঘদিনের অনিয়ম দূর করতে গিয়ে প্রথমেই প্রবল প্রতিরোধের মুখে পড়তে হয় এই ইউনিটকে। যখন বিমানবন্দরে বিভিন্ন কোটারি স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হতে লাগল, তখনই আর্মড পুলিশ যাতে কোনো কাজ করতে না পারে তার জন্য প্রতি পদে বাধা সৃষ্টি করা হলো। এর পরও আর্মড পুলিশ তাদের অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখে। গত ১ জুন প্রতিষ্ঠার চার বছর পর করে পঞ্চম বর্ষে পদার্পণ করেছে। এরই মধ্যে বিমানবন্দরে বিভিন্ন ধরনের প্রায় পাঁচ হাজার অপরাধীকে গ্রেফতার করে আইনের আওতায় এনেছে। প্রায় ৩০০ কোটি টাকার চোরাচালানি পণ্য জব্দ করে সরকারি রাজস্ব দিয়েছে। বিমানবন্দর আর্মড পুলিশ সূত্র মতে, ২০১০ থেকে চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত শুধু যাত্রী হয়রানির দায়ে গ্রেফতার হয়েছে ৫৬১ জন, একই সময়ে বিভিন্ন দেশের মুদ্রা ব্যবসায়ী চক্রের গ্রেফতার হয়েছে ১৬১ জন, মালামাল পাচারকারী ১২৭ জন, অবৈধ অনুপ্রবেশকারী ৫৪০ জন, মুদ্রা পাচারকারী আটজন, হকার/টোকাই/পোর্টার ৪৯১ জন, মানবপাচারকারী ২৯ জন, জাল বা ভুয়া পাসপোর্টধারী ৬৮৯ জন, রোহিঙ্গা ১১৭ জন, মালামাল চোর ২৯৭ জন, ছিনতাইকারী/চাঁদাবাজ/পকেটমার ৯৭ জন, লাগেজ চোর/কাটা ৭০ জন, অস্ত্রধারী তিনজন, প্রতারক ১৩ জন, মাদকসেবী ৪৭ জন, দালাল ৩০৭ জন, মাদক ব্যবসায়ী ৬ জন, ভুয়া পরিচয়দানকারী ১৫ জন, সিএএবি সদস্য ৫৩ জন, আনসার সদস্য ১৪ জন, বিমান সদস্য ৬৮ জন, বিভিন্ন ট্রান্সপোর্টের ৭৬ জন। এ ছাড়াও অন্যান্য ৩৭৮ জনকে আটক করা হয়েছে।
আয় বেড়েছে সরকারের : এয়ারপোর্ট এপিবিএন প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৩০০ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করে দিয়েছে সরকারকে। স্বর্ণ উদ্ধার হয়েছে ১৯৩ কেজি। ১২ হাজার ৪২২ কার্টন সিগারেট, ১৬ কোটি ৯৫ লাখ ৮০ হাজার ৩২৮ টাকা বৈদেশিক মুদ্রা এবং ১৬ দশমিক ১৫ কেজি হেরোইন উদ্ধার করা হয়। এয়ারপোর্ট আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের ইউনিট গত তিন বছর চোরাচালান প্রতিরোধ ও উদ্ধারে পরপর চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে।
হারানো জিনিস ফিরে পাওয়ায় যাত্রীদের আস্থা : যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী দম্পতি তাসলিমা সিদ্দিকি ও সাবের সিদ্দিকি সম্প্রতি দেশে আসেন। ভোরে বিমানবন্দর নামার পর বেল্টে অপেক্ষা করতে থাকেন লাগেজের জন্য। এমন সময় চোখেমুখে পানি দিতে গিয়ে নিজের আইপ্যাডটি ওয়াশ রুমে রেখে আসেন তাসলিমা সিদ্দিকি। পরে সেটি ভুলক্রমে রেখে চলে যান। এমন সময় দুই ক্লিনার ওই আইপ্যাডটি নিয়ে নিজেদের মধ্যে বাকবিত-া শুরু করেন। এ অবস্থা দেখে এপিবিএন সদস্য নাসরিন সেখানে যান। একপর্যায়ে তাদের কাছ থেকে আইপ্যাডটি নিয়ে সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার আলমগীর হোসেনের কাছে জমা দেন। আইপ্যাডটি নেয়ার পর আলমগীর হোসেন দেখেন সেটি চালু রয়েছে এবং যাত্রীর ফেসবুক অন রয়েছে। পরে সেখান থেকে তিনি এপিবিএনের নিজস্ব ওয়াইফাইয়ের কানেকভিটি নিলে তার কন্যা আনিশা কাদিরের ফেসবুকে ম্যাসেজ পাঠান। পরে তিনি জানালেন, তার মা বাংলাদেশে গেছেন আর তিনি রয়েছেন আমেরিকায়। তিনি পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য কিছুক্ষণ সময়ও চান। এর মধ্যে এএসপি আলমগীর আরো দেখতে পান যে, আইপ্যাডে ওই মহিলার স্কাইপি অ্যাকাউন্টও রয়েছে। সেখান থেকে তিনি তার ভাই সৈয়দ আহমেদের মোবাইল নম্বর নিয়ে কল করেন। পরে জানতে পারেন তিনি চট্টগ্রামে আছেন। সাথে সাথে এও জানান, তিনি একজন ব্যক্তিকে যথসম্ভব দ্রুত পাঠানো চেষ্টা করবেন। এর কয়েক মিনিট পর তিনি জানান, মাসুম রেজা রনি নামে এক ভাতিজাকে পাঠাবেন। পরে মাসুম রেজা রনি ১৫ মিনিটের মধ্যেই বিমানবন্দর এপিবিএন অফিসে পৌঁছেন এবং সিনিয়র এএসপি আলমগীর হোসেনের সঙ্গে দেখা করে আইপ্যাডটি নিয়ে যান। শুধু এ ঘটনাই নয়, বিমানবন্দরের ভেতরে ও বাইরে হারানো লাগেজ ফেরত দিয়ে যাত্রী সাধারণের ওপর আস্থা অর্জন করেছে এপিবিএন। গত চার বছরে হাজারেরও অধিক যাত্রীর হারানো লাগেজ ফেরত দিয়েছে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন।
কমে গেছে দালালের দৌরাত্ম্য : যে দালালের দৌরাত্ম্যে একসময় অতিষ্ঠ ছিলেন যাত্রীরা, সেখানে এখন দালাল নেই বললেই চলে। সার্বক্ষণিক নজরদারির কারণে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। অনেক সময় পরিবহনের কিছু শ্রমিক যাত্রীদের হয়রানি করার চেষ্টা করলেও পুলিশ তাদের গ্রেফতার করে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে পাঠিয়ে তাৎক্ষণিক সাজার ব্যবস্থা করায় এ অবস্থা এখন আর নেই।
লাগেজ চুরি ও কাটাচক্র নির্মূল : শাহজালালে লাগেজ চুরি করে কোটিপতি জয়নালের নাম আগেই থেকে জানা। শুধু বিমানবন্দরে লাগেজ চুরি করে কোটিপতি বনে যান জয়নাল। এপিবিএন প্রতিষ্ঠার কিছু দিনের মধ্যেই জয়নালকে আটক করে পুলিশ। এরপর ছাড়া পেয়ে আবারো আগের পেশায় ফেরেন জয়নাল। কিন্তু পিছু ছাড়ে না পুলিশও। আবারো তাকে আটক করে চুরির সব মালামাল জব্দ করা হয়। চুরি ও লাগেজ কাটার বিরুদ্ধে কড়া নজরদারির কারণে বিমানবন্দরে লাগেজ চুরি ও কাটা বিষয়টা শোনা যায় না বললেই চলে।
যাত্রীরা যা বললেন : সৌদি আরব থেকে আসা যাত্রী আব্দুর রশিদ বলেন, আগের চেয়ে বিমানবন্দরের সার্বিক চিত্র অনেক ভালো। একসময় বিমানবন্দরে যে অরাজকতা ছিল, এখন তা নেই। সন্তুষ্ট হওয়ার মতো পরিবেশ বলে উল্লেখ করেন তিনি। দুবাই থেকে আসা যাত্রী আশরাফুল আলম বলেন, তিন বছর পর তিনি দেশে ফিরলেন। তিন বছর আগের বিমানবন্দর আর এখনকার বিমানবন্দরের মধ্যে অনেক তফাৎ। বাইরের পরিবেশ দেখে সন্তুষ্ট প্রকাশ করেন তিনি।
সার্বিক বিষয়ে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার আলমগীর হোসেন বলেন, কার্যকর পুলিশি ব্যবস্থা যে একটি উত্তম বিনিয়োগ হতে পারে তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ হতে পারে বিমানবন্দর আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন। গত প্রায় পাঁচ বছরে ৩০০ কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ে সরাসরি সহায়তার পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের পাঁচ হাজার অপরাধীকে আটক করেছে বিমানবন্দর আর্মড পুলিশ। তা ছাড়াও নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার রাজস্ব প্রবৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে উল্লেখযোগ্য হারে। বিমানবন্দর আর্মড পুলিশের চোরাচালানবিরোধী অভিযান অধিকতর রাজস্ব আদায়ে অনুঘটক হিসেবেও কাজ করেছে, যার ফলে গত পাঁচ বছরে বিমানবন্দর থেকে রাজস্ব আয় দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। তিনি বলেন, যাত্রী হয়রানি বকশিস ও ট্রিপ মানির নামে অবৈধভাবে অর্থ আদায় কমেছে উল্লেখযোগ্য হারে। প্রবাসীদের টার্গেট করে ডাকাতবেশী একশ্রেণির পরিবহন শ্রমিকদের সর্বস্ব কেড়ে নেয়ার ঘটনা ছিল নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার; তা এখন শূন্যের কোটায় নেমে এসেছে। লাগেজ কেটে মালামাল চুরি কমেছে উল্লেখযোগ্য হারে। বিমানবন্দরের বহিরাঙ্গনে হারিয়ে যাওয়া লাগেজ পৌঁছে দেয়া হচ্ছে নিজ নিজ মালিকদের কাছে। এ হচ্ছে বিমানবন্দর বদলে যাওয়ার অন্তর্নিহিত রহস্য। তিনি আরো জানান, বর্তমানে একজন সিওর নেতৃত্বে এক হাজার ১৮০ জন সদস্য রয়েছেন। এর মধ্যে ১২ জন রয়েছেন বিসিএস সহকারী পুলিশ সুপার পদমর্যাদার কর্মকর্তা। ডিউটিকালীন প্রায় সাড়ে ৩০০ সদস্য সার্বক্ষণিক নজরদারিতে রাখেন শাহজালালকে। এ ছাড়া যুগের চাহিদা এবং পরিবর্তিত বিশ্ব নিরাপত্তা প্রেক্ষাপট বিবেচনায় রেখে তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন অনুবিভাগ। জরুরি এবং জিম্মিদশা থেকে উত্তরণের জন্য কার্যক্রম শুরু করেছে ক্রাইসিস রেসপন্স টিম (সিআরটি)। যথাযথ টহল পরিচালনার জন্য মাঠে নেমেছে বাইক পুলিশ। বিমানবন্দরকে সার্বক্ষণিক নজরদারিতে রাখতে বসানো হয়েছে সিসিটিভিসহ আধুনিক সার্ভিলেন্স মেকানিজম।

0 comments:
Post a Comment