নতুন পে স্কেল বাস্তবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা


সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন পে স্কেলে টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড অন্তর্ভুক্ত নিয়ে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। গতকাল সোমবার সচিবালয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে বাংলাদেশ সরকারি কর্মচারী সমন্বয় পরিষদের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। সরকার যখন নতুন পে স্কেল বাস্তবায়ন শুরুর প্রক্রিয়া প্রায় চূড়ান্ত করে ফেলেছে, তখন টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড নিয়ে সরকারি কর্মচারীদের অনড় অবস্থান নতুন করে জটিলতার সৃষ্টি করেছে। 
জানা গেছে,নতুন পে স্কেল বাস্তবায়ন শুরুর আগে আরও কিছু বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে সরকারকে। ১ জুলাই থেকেই এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা নতুন পে স্কেল অনুযায়ী বেতন পাবেন কি-না সে বিষয়ে এখনও পরিষ্কার কিছু বলা হয়নি। 
ফলে সারাদেশের পাঁচ লাখ শিক্ষক দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। এর সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পদমর্যাদা উন্নীত করার বিষয়টিও। জানা গেছে, অধ্যাপকদের মর্যাদা বৃদ্ধি নিয়ে আপত্তি রয়েছে অর্থমন্ত্রীর। এসব বিষয় সুরাহা না করা পর্যন্ত নতুন পে স্কেল চূড়ান্ত করা সম্ভব হচ্ছে না। সহসাই সমাধান হবে_ এমন আভাসও সরকারি নীতিনির্ধারকদের মধ্যে এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। ফলে সরকারি চাকরিজীবীদের বহুল প্রত্যাশিত নতুন পে স্কেল বাস্তবায়ন নিয়ে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। 
গতকাল সচিবালয়ে সরকারি কর্মচারী সমন্বয় পরিষদের নেতারা অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে তাদের দাবি জানিয়ে বলেন, নতুন পে স্কেলে বড় ধরনের বৈষম্য রয়েছে। এটি বাস্তবায়ন শুরু হলে সরকারি চাকরিজীবীরা বিশেষ করে নিচের স্তরের কর্মচারীরা 'আর্থিক সুবিধা' থেকে বঞ্চিত হবেন। নতুন পে স্কেলে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে বৈষম্য কমিয়ে আনতে প্রস্তাবিত ২০টির পরিবর্তে ১৬টি গ্রেডে বেতন স্কেল নির্ধারণের পাশাপাশি সর্বনিম্ন গ্রেড ৮ হাজার ২৫০ টাকার পরিবর্তে কমপক্ষে ১০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবি জানান তারা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. মোহাম্মদ ফরাস উদ্দিনের নেতৃত্বে গঠিত পে কমিশনের টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেডের প্রচলিত প্রথা বাদ দিয়ে ধাপ কমিয়ে ১৬ গ্রেডে বেতন স্কেল নির্ধারণের সুপারিশ করে। এরপর মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোশাররাফ হোসাইন ভূইঞার নেতৃত্বে গঠিত সচিব কমিটি পে কমিশনের মতো টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড বাতিলের সুপারিশ করলেও বর্তমানের মতো ২০টি গ্রেডে বেতন দেওয়ার পক্ষে সুপারিশ করে। সচিব কমিটি তাদের প্রতিবেদন গত ১৩ মে অর্থমন্ত্রীর কাছে জমা দিয়েছে। 
গতকালের বৈঠকে সরকারি কর্মচারী সংগঠনের নেতাদের বক্তব্য মনোযোগ সহকারে শুনেছেন মুহিত। বুঝতে চেষ্টা করেন তাদের প্রস্তাবগুলো। কোনো কোনো বিষয়ে আপত্তিও করেন অর্থমন্ত্রী। তবে টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড যে বহাল রাখা হবে, সে বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্তের কথা জানাননি মুহিত। বলেছেন, বিষয়টি নিয়ে আরও পর্যালোচনা করতে হবে। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, আগস্ট মাসেই নতুন পে স্কেল অনুমোদনের জন্য মন্ত্রিসভায় উঠবে। এর আগে গত সপ্তাহে সচিবালয়ে সাংবাদিকদের তিনি বলেছিলেন, সোমবার ৩ আগস্ট মন্ত্রিসভায় উঠবে। এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে ক্ষুব্ধ অর্থমন্ত্রী বলেন, 'নো' আমি এ কথা বলিনি। এ সময় মুহিত জানান, নতুন পে স্কেল নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করা হবে। তারপরই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত বৈঠকে বাংলাদেশ সরকারি কর্মচারী সমন্বয় পরিষদের সভাপতি মো. হানিফ, মহাসচিব মো. রেজাউল মোস্তফাসহ অন্য কর্মকর্তারা বক্তব্য রাখেন। এ সময় দুই পাতার লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সংগঠনের সভাপতি। 
সংগঠনের নেতারা অর্থমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে বলেন, সরকারি চাকরিতে নিচের দিকের কর্মচারীদের পদোন্নতির সুযোগ খুবই সীমিত। এ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড প্রথা বহাল রাখার দাবি যৌক্তিক ও ন্যায়সঙ্গত। কর্মচারীরা দাবি করেন, প্রস্তাবিত অষ্টম বেতন কাঠামোতে কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে স্কেল অনুযায়ী বেতনের তফাৎ খুব বেশি। এতে কর্মকর্তাদের বেশি সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, সব সময়ই কর্মচারীদের চেয়ে কর্মকর্তাদের স্কেলের ব্যবধান বেশি ছিল। 
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রস্তাবিত পে স্কেল চূড়ান্ত করার বিষয়ে এখন পর্যন্ত তাদের কাছে দিকনির্দেশনা আসেনি। মন্ত্রিসভার বৈঠকে নীতিগত অনুমোদন দেওয়ার পরই শুরু হবে বাস্তবায়ন। তার আগে প্রস্তাবিত অষ্টম পে স্কেল বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে। তবে যখনই প্রজ্ঞাপন জারি করা হোক, ১ জুলাই থেকেই নতুন পে স্কেল কার্যকর করা হয়েছে। কিছু দেরি হলেও এরিয়ার বা বকেয়া হিসেবে 'বর্ধিত' বেতন পাবেন সরকারি চাকরিজীবীরা।
বর্তমানে সরকারি চাকরিজীবী প্রায় ১৪ লাখ। এর মধ্যে আশিভাগই কর্মচারী। এর বাইরে স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা, বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে কর্মরত জনবল ও এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা সরকারি কোষাগার থেকে বেতন পান। তারা সবাই নতুন পে স্কেলের সুবিধা পাবেন। তবে এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা 'বর্ধিত' বেতন পাবেন ছয় মাস পর। এখন সরকারি চাকরিজীবীরা মূল বেতনের সঙ্গে ২০ শতাংশ হারে যে 'মহার্ঘভাতা' পাচ্ছেন, নতুন পে স্কেল অনুযায়ী, বেতন দেওয়া শুরু হলে তখন আর এই ভাতা থাকবে না। মহার্ঘভাতা প্রস্তাবিত মূল বেতনের সঙ্গে সমন্বয় করা হবে। 
সর্বশেষ, ২০০৯ সালে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাড়ানো হয়। সে অনুযায়ী, সরকারি চাকরিজীবীরা এতদিন সর্বনিম্ন ৪,১০০ টাকা ও সর্বোচ্চ ৪০ হাজার টাকা 'বেসিক' ধরে বেতন পেয়ে আসছিলেন। এর সঙ্গে তারা পাচ্ছেন মূল বেতনের ২০ শতাংশ হারে মহার্ঘভাতা, যা ২০১৩ সালের ১ জুলাই থেকে কার্যকর করা হয়। নতুন পে স্কেল অনুযায়ী, বেতন দেওয়া শুরু হলে এই মহার্ঘভাতা আপনা-আপনি বিলুপ্ত হয়ে যাবে। 

0 comments:

Post a Comment

Video of Day




Twitter Follow

Translate